অভ্যেস
দুয়ারে গল্প
পাশের ঘরে ঈশিতা আজই বিকেলে ছুটি কাটিয়ে ফিরেছে। পাড়ায় ঢুকতেই শুনেছে কাকিমার অকস্মাত চলে যাওয়ার খবর। খানিক কান্না কাটিও করেছে। গত এক বছর একই উঠানের দু'পাশে বাস ঈশিতা ও ননী বাবুর। টাকার অভাবে একটি এক কামরার টিনের চালের ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া ঈশিতাকে। নিজেরা থাকতেন পাশের টালির ঘরে। দুই অভাবী মানুষের সুখের গন্ডি টানা দুটি বলয়। রাতের বেলা কাকিমা ঈশিতাকে ডেকে তরকারি দিতেন। সারাদিন পড়াশুনা করে কি যে হাত পুড়িয়ে রান্না করে মেয়েটা !
কাকুর ফেরার অপেক্ষায় ছিল ঈশিতা। আওয়াজ পেতেই এক গেলাস জল নিয়ে উঠোন পেরিয়ে চলে যায় পাশের ঘরে। মানুষটা আজ বড় একা। পাশে কেউ নেই। হাতের আলতো ছোঁয়ায় খুলে গেল টিনের দরজা। অভ্যস্ত পায় মাথা ঝুঁকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো ঈশিতা। একটি মাত্র ঘর, দু ভাগ করে শোয়ার ও খাওয়ার ব্যবস্থা। মাঝে কোমর বরাবর ইঁটের গাঁথনি। এপাশে মেঝেয়ে পাতা মাদুর, অবিন্নস্ত মলিন চাদর ও দুটি দোমড়ানো বালিশ। দেয়ালের ও পাশে হ্যারিকেনের হালকা গেরুয়া আলোয় বেশ স্পষ্ট সব কিছু। কাকু পেছন ফিরে বসে খাচ্ছেন। খানিক অবাক হলো ঈশিতা। কি খাচ্ছেন ? কখন বানালেন ? সে জেনেছে কাকিমার দুপুরে স্ট্রোক হয়েছিল। ডাক্তার ডাকার আগেই সব শেষ। তবে কি রান্না করার পরেই !
নিঃশব্দে কাকুর পেছনে এসে দাঁড়ালো ঈশিতা, কিন্তু আড়ালের ওপাশে চোখ যেতেই যা দেখলো তাতে তার হৃৎপিণ্ড মুহুর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত পা নিমেষে বরফ হয়ে অচল হয়ে গেল। শুধু তার হাত থেকে খসে পড়া জলের গেলাসের আওয়াজে খানচুর হলো নৈশব্দ। কাকু পেছন ফিরে বসে তৃপ্তি করে খাচ্ছেন আর রোজকার মতই কাকিমা সামনে বসে খাবার বাড়ছেন। হ্যারিকেনের আবছা আলোয় কাকিমার চেহারা স্পষ্ট। সেই একই ডুরে কাটা শাড়ী। গোলগাল মুখ। এক হাঁটু মুড়ে কাকুর মুখের দিকে চেয়ে আছেন পরম স্নেহে। ঈশিতাকে দেখে স্মিত হেসে বললেন, "আজ তোর জন্য মাছের টক বানিয়েছিলাম। সে আর দেওয়া হলো না রে।"
বাকরুদ্ধ ঈশিতা যেন অসাড় জড়পদার্থ। কাকুর দিকে চেয়ে কিছু বলতে চাইল সে। যেন মনের কথা বুঝেই ঈশিতার দিকে ঘুরে তাকালেন ননী বাবু, আসতে আসতে বললেন, "কি বল তো, তোর কাকিমা আর আমি একদিনের জন্যেও কেউ কাউকে ছেড়ে থাকিনি, তাই ও ফিরে এলো। ভয় করিসনি মা, ও তো তোর কাকিমা!"
ঈশিতার শরীরে খানিক রক্ত সঞ্চালন হলো। কোনোক্রমে সারা শরীরের বল একত্রিত করে সে এক ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। পেছনে শোনা গেল বৃদ্ধ যুগলের চাপা হাসির আওয়াজ।
বেশ বেলার দিকে ঘুম ভাঙলো ঈশিতার। মাথা তখনও লোহার বলের মত ভারী। সে ঘুমিয়েছে না অচৈতন্ন হয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না।
ঘুম ভাঙলো একটা শোরগোলে। বেরিয়ে দেখে পাড়ার দুচারজন কর্তা জড় হয়েছে উঠানে। কি সব আলোচনা চলছে। ওরা যা জানালো তা এই রকম,
কাল রাতে স্ত্রীর দেহ সৎকার করে ননীবাবু অনেক্ষন ঘাটে বসেছিলেন। তারপর জোয়ার এলে সেখান থেকেই নদীতে ঝাঁপ দেন। ওঁনার দেহ আজ সকালে উদ্ধার হয়েছে ১৫ কিলোমিটার দূরে। সৎকারের ব্যাবস্থা করতে হবে।
ঈশিতা আর দেরী করেনি ও ঘর ছাড়তে।
শোনা যায় প্রায় রাতে নাকি ননীবাবুর টালির ঘরে হ্যারিকেনের আলো দেখা যায় !!
সংগৃহীত।
সমাপ্ত
দুয়ারে গল্প ওয়েবসাইটে গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। গল্পটি কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন এবং ফ্যামিলি ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। নতুন নতুন গল্পের স্বাদ নিতে সোশ্যাল মিডিয়াতে "দুয়ারে গল্প" ফলো করুন।
Thanks for reading. If you enjoyed the story, leave a comment and share it with Friends and Family.
Follow Duare Golpo on Facebook, Instagram, Threads, X, YouTube, and Pinterest for more stories and updates.

Social Plugin