কাঁঠালীমামা - আশাদেবী - দুয়ারে গল্প

কাঁঠালীমামা

আশাদেবী

Kanthali Mama Duare Golpo Bangla Story







মাথার কাছে একরাশ কাঁঠালের ভূতি আর মুখের চারিদিকে নীল মাছির চক্র যার দেখবেন সেই আমার মামা। মামা লোক খুব ভাল। খান দান নাক ডাকিয়ে ঘুমোন, কিন্তু কাঁঠাল দেখলেই তাঁর চিত্ত বিকল হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই আমরা তাঁর কাঁঠাল খাওয়ার খ্যাতিশুনতে শুনতে প্রায় মুগ্ধ। কিন্তু সে সব আলোচনা শুধু শোনা আর মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও কাজ নেই। শুধু শুনে শুনেই মামার ওপর আমাদের এমন ভক্তি হয়ে গেল যে আমরা মনে মনে তাঁকে প্রায় পূজো করতে আরম্ভ করলাম।


শুধু একজন এসব অন্ধ স্তাবকতার ধার দিয়েই গেল না, সে হলো মামার বাড়ির ভাগলপুরী গরু। হয়তো খাওয়ার ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী সে মোটেই সইতে পারে না, হলোই বা মনিব; মনিবের জন্যে তো তার সব চাইতে প্রিয় খাবার ছাড়তে পারে না।



আমরা তাঁকে আদর করে ডাকতাম—কাঁঠালী মামা বলে, কিন্তু কাঁঠালী মামার 'কাঁ' শুনলেই গরু চোখ পাকিয়ে ফোঁস করে প্রতিধ্বনি করতো। মামা উঠতেন চোটে—

কি অকৃতজ্ঞ গরু দেখলি ভজা—!

আমি বলি ওকে বেচে দাও—

কেন রে? মামার বিস্মিত প্রশ্ন—

বলিস কিরে?

তা নাহলে মনিব চেনে না, যার খাবে তারই দাড়ি উপড়াবে?—

কাঁঠালী মামা রামছাগলের মতো দাড়িতে সযত্নে হাত বোলাতে লাগলো।

কি করি বল তো—? এবার মামা আমারই মতামত চেয়ে বসলেন।

কি আবার করবে বেচে দাও না।

তুই বলিস কি রে, বামুন হয়ে গরু বেচবো! না—না, তা হয় না, তা হয় না। ওটা আমার পৈত্রিক সম্পত্তি।

সে কি?

সে অনেক কথা! বাবা মারা গেলন, সম্পত্তি ভাগ নিয়ে আমাদের তিন ভায়ের মধ্যে প্রায় দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। কিন্তু গরু কি করে ভাগ হবে?

কেন? দাম ধরে নিয়ে; কথার ওপরেই আমি বলে উঠলাম।

দাম ধরে! কাঁঠালীমামা খাজা-কাঁঠালের ঢেঁকুর তুলে ভেংচে বললে, দামটা তা হলে তুই দিস?




আমি দেব কেন? আমি হঠাৎ থতমত খেয়ে গেলাম।

কেন মূল্য ধরে বেচলে বামুনের অকল্যাণ হবে আবার গরু কেটেও ভাগ করা যায় না। তার ওপর যে খাওয়াবে তারই ক্ষতি। খাওয়াবে কে? শেষে সাতদিন ধরে ঠিক হতে হতে গরু না খেয়ে থাকতে থাকতে পাগল হয়ে গেল। যে ওর কাছে যায় তাকেই কুকুরের মতো কামড়াতে আসে।

—ভারি মুশকিল সেখানেই আসান, শেষে ঠিক হলো যার কাছে গরু নিজের ইচ্ছেয় যাবে গরু তারই হবে। কিন্তু ওরা তো জানতো না আসল কায়দা, আমি জানতাম।। আমি এক পেট কাঁঠাল খেয়ে এক গাছতলায় একটু শুয়েছি। হঠাৎ গরুটা আমার দু'ভায়ের মাথার ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে আমার মাথার এক গাছা চুল কামড়ে দিল।



সে কি?

হ্যাঁ তাই, দিল বটে কিন্তু গরু পেয়ে আনন্দে আমায় হাসপাতালে যেতে হলো। টাকে হাত বুলাতে লাগল কাঁঠালীমামা।

তারপর? আমি বললাম।

তারপর আর কি, গরু আমার হলো, কিন্তু হলে কি হবে গরুটা মানুষ না। সব সময়েই মেজাজে থাকে, না দেয় দুধ না শোনে কথা। গরু নিয়ে প্রায় যে-পরিস্থিতিতে পড়েছি!

বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। কাঁঠালীমামা বিশটা রুটি আর দুটো আস্ত কাঁঠাল দিয়ে সান্ধ্য-ভোজন সমাধান করে কেবল এসে রকে বসছে।



দাদা আছেন নাকি? যদু মুদী ঘরে ঢুকলো।

মামার মেয়ে খেদী বাঁ হাতে নাকের নোলক খুঁটতে খুঁটতে বললে—

বাবা তো বাড়ি নেই।

বলিস কি রে আমি তো এই মাত্র বাড়িতে কথা শুনলাম।

না, কই না তো।



আজ দু'মাস হলো ঘোরাচ্ছে আজ না কাল, কাল না পরশু করে। আজ টাকা না দিলে গলায় গামছা দিয়ে আদায় করব। এই আমি বসলাম বারন্দায়। কতক্ষণ পরে ধোপা, ক্রমে বারান্দা ভরে গেল। লোকের আস্ফালন আর চিৎকারে যত কাকের দল চালে এসে জড়ো হয়ে তারস্বরে কাক কা ধ্বনিতে মুখর করে তুলল। জপ করতে লাগল—কি করা যায়। এরা সবাই দেখেছে মামা ভেতরেই আছে। রোজ রোজ তো আর ফেরাতে পারা যায় না। কঁঠালীমামা ঘনঘন দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলো।

অবশেষে কাঁঠালই মামাকে বাঁচালো।—




মামার ছোট মেয়ে খেদীকে মামা ডেকে বললেন, দেখ যারা বারান্দায় বসে আছে তাদের প্রত্যেককে এক একটা পাকা কাঁঠাল দে, বল, দেখুন বাড়ির প্রথম ফল বাবা আপনাদের খেতে দিলেন, আপনারা খান, বাবা আসছেন।

বাঃ—বাঃ কাঁঠাল তো, দে রে আর দুটো দে—। বেশ খাজা বলেই মনে হচ্চে। যদু মুদী ভুঁড়িতে হাত বোলাতে লাগলো। ওরে—ও খেদী একটা গলা কাঁঠাল-টাঠাল আছে— তো দে না—রে—




ধোবাটা বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ গেল গেল করে মামা চেঁচিয়ে উঠলো—রাগী গরুটা কে যেন ছেড়ে দিয়েছে। বাঁধা গরু ছাড়া পেয়ে কাঁঠালের গন্ধে পাগল হয়ে ছুটে আসছে বেয়নের মতো শিং উঁচিয়ে, দেখতে দেখতে বারান্দা খালি—শুধু পাকা কাঁঠালগুলো গরুটা পাগলের মতো খেতে লাগল।




হঠাৎ পট—পটা—পট—

সামনের বেড়া ভেঙে যদু গরুটাকে পাগলের মতো মারতে লাগলো। কিন্তু সবই ব্যর্থ করে দিয়ে কাঁঠালের মুষলটা মুখে করে গরু সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চোখে জ্বলন্ত জিঘাংসা— তেলের কলের চোহার মতো নাকের বড় বড় ফুটো দুটো দিয়ে ঘন ঘন অগুরুর গন্ধের মতো কাঁঠালের গন্ধ বেরুচ্ছে। এবার প্রায় মুষল পর্ব শুরু হয়ে গেল।



গলির মুখে শিং উঁচিয়ে রাণাকুম্ভের বুঁদিগড় দখল করবার মতো করে দাঁড়িয়ে, দাওয়ায় নজর বন্দী যদু মুদী, ধোবা প্রভৃতি পাওনাদার ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে—

পালাও—পালাও—গরুটা পাগল—খুন করে ফেলবে। কত লোক যে ও খুন করেছে তার ঠিক নেই, কত লোক জখম হয়েছে—কত লোকের মাথা ফেটেছে—কত লোকের —রেডিওর খবর বলবার মতো করে কাঁঠালীমামা উপরের জানালায় দাঁড়িয়ে—মুখে চোঙা দিয়ে বলতে লাগলেন।

গরুটা কি কথা বোঝে? চোঙার শব্দে এবার সে এঁড়ে বাছরের মতো তড়াক—তড়াক করে নাচতে লাগলো। আর কানের ভেতর কেমন পটাস্-পটাস্ শব্দ হতে লাগলো।

সর্বনাশ! করি কি—যদু প্রায় কেঁদে ফেলল। হঠাৎ ধোবাটা এক কাণ্ড করে বসল। মাথায় দেওয়া ময়লা কাপড়ের বোঁচকাটা ছুঁড়ে মেরে দিল গরুর দিকে— এবার প্রায় কুরুক্ষেত্র বেধে গেল। এ প্রায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মতোই খেলা চলল। যেমন করে 'তিন বাণে কাটলেন অশ্বের চারি হয়' তেমনি করে গোমাতা সেই ময়লা কাপড়ের পুঁটলি শিরে ধারণ করলেন অর্থাৎ বেয়নেটের মতো শিং-এ নৈবিদ্যের মোন্ডার মতো আটকে রইল। আর সেইভাবে এ, হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত টেনে আনবার মতো ছুটে আসতে লাগল।




সবুজ গম্বুজের মতো নিরপেক্ষ দর্শক কাঁঠালীমামা এবার রসের মধ্যে রসগোল্লার মতো ডুব দিলেন।

ওরে—বাঁচাও মামা বাঁচাও, আমি আর টাকা চাই না, আমায় বাঁচাও। গম্ভীর গলায় মামা বললে, সত্যি বিপদ গেলে নিজমূর্তি ধারণ করবে না?




তোমার পায়ে ধরছি—ছুটে ঘরে গিয়ে যদু মামার পা জড়িয়ে ধরল।

ওরে ভজা, সব দরজা—সব খুলে দে আর গরুটাকে গোটা চারেক কাঁঠাল সামনে দিয়ে দে—তা হলেই শান্ত হবে।

একটা নূতন শাড়ি কিনে দিস ওকে এবার—কাঁঠালীমামা নাকের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে নাকিসুরে স্বগতোক্তি করলেন।


সমাপ্ত



দুয়ারে গল্প ওয়েবসাইটে গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। গল্পটি কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন এবং ফ্যামিলি ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। নতুন নতুন গল্পের স্বাদ নিতে সোশ্যাল মিডিয়াতে "দুয়ারে গল্প" ফলো করুন।


Thanks for reading. If you enjoyed the story, leave a comment and share it with Friends and Family.

Follow Duare Golpo on Facebook, Instagram, Threads, X, YouTube, and Pinterest for more stories and updates.